দৈনিক আদ্যোপান্ত

গল্প

গহনা শিল্পে নারীর সাফল্য

গহনা শিল্পে নারীর সাফল্য

ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা হাফসা মোসলেমের জীবনযাত্রা কখনো স্বপ্নের সোজা পথে এগোয়নি; পারিবারিক দায়িত্ব আর আর্থিক সংকট তাকে বাধ্য করেছিল নতুন পথে পা বাড়াতে। ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পরও পরিবার তাকে নিরাপদ সরকারি চাকরি বা ব্যাংকিং পদের দিকে ধাবিত করতে চেয়েছিল। তবে হাফসার গহনার প্রতি শৈশবের আকর্ষণ ও সন্তানকে ঘরে সময় দিতে চাওয়া তাকে ব্যবসায়িক দৌড় থেকে দূরে রাখে।২০২১ সালে, যখন পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে এবং পিঠের পিঠে আর কোনো বিকল্প না থাকে, হাফসা মাত্র দশ হাজার টাকার সঞ্চয় নিয়ে গহনা ব্যবসা শুরু করেন। তিনি ফেসবুকে "আজ থেকে গহনা বিক্রি শুরু করছি" শিরোনামে প্রথম পোস্ট করেন; প্রথম অর্ডারটি তার কলেজের এক বন্ধুর কাছ থেকে আসে, যিনি দীর্ঘদিনের সংযোগ ছাড়াই হাফসার প্রথম গ্রাহক হয়ে ওঠেন।প্রারম্ভিক সন্দেহের পরেও হাফসার অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং পণ্যের প্রতি গভীর জ্ঞান তাকে দ্রুত সাফল্যের পথে নিয়ে যায়। তার ব্র্যান্ডের নাম "আট কুঠুরি নয় দরজা"—ফকির লালন শাহের "খাঁচার ভেতর অচিন পাখি" গানের অনুপ্রেরণায়, যা জীবনের আটটি কুঠুরি ও নয়টি দরজার প্রতীকী অর্থকে তুলে ধরে। হাফসা বিশ্বাস করেন, কোনো সংকটই মানুষের সামনে নতুন দরজা খুলে দেয়, আর তার উদ্যোগই সেই দরজা খুলে দেয় গ্রাহকদের জন্য।ব্র্যান্ডের ট্যাগলাইন "হোয়ার ট্র্যাডিশন ব্লেন্ডস উইথ ট্রেন্ড" দিয়ে হাফসা ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনকে আধুনিক প্রবণতার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন রূপ দিচ্ছেন। তিনি পুরোনো গহনা পুনর্নবীকরণ, তুলনামূলক কম দামে টেকসই গহনা সরবরাহ এবং দেশের নিজস্ব মোটিফে কালো গহনা (ব্ল্যাক জুয়েলারি) প্রচারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার নকশায় গোল্ড প্লেটেড, সিলভার প্লেটেড, তামা ও পিতল ব্যবহার করে বহুমুখী পণ্য লাইন গড়ে তোলা হয়েছে।আজ হাফসার উদ্যোগে দশজন দক্ষ কারিগর কাজ করছেন; চারজন স্থায়ী কর্মী এবং চুক্তিবদ্ধ কর্মীদের সঙ্গে ধানমন্ডিতে একটি শারীরিক আউটলেটও রয়েছে। মাসিক বিক্রির পরিমাণ আট থেকে দশ লাখ টাকার মধ্যে পৌঁছেছে, যা তার উদ্যোগের দ্রুত বৃদ্ধি নির্দেশ করে। হাফসা বলেন, ব্যবসার মূল পুঁজি টাকা নয়, সততা ও নিরলস পরিশ্রম। তার গল্প দেখায় কীভাবে প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া স্বপ্ন, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের গহনা শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।