দৈনিক আদ্যোপান্ত
Topic Ads 1
সন্ত্রাসী গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার দখলে খুলনা শহর

সন্ত্রাসী গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার দখলে খুলনা শহর

খুলনা মহানগরী এবং পুরো জেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ হিংসা নাগরিকদের জীবনকে আতঙ্কে ডুব দিয়েছে। বাবা, মা, স্বামী, ভাই‑বোন—প্রতিটি পরিবারের শোকের কারণ এখন শহরের গলিতে গুলি, গণপিটুনি এবং ভয়াবহ অপরাধ।তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে খুলনা মহানগরীসহ জেলায় মোট ৭৫টি গুলি ও গণপিটুনি সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। কেএমপি (খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ) জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে একজন, ফেব্রুয়ারি মাসে চারজন, মার্চে চারজন, এপ্রিলের দুইজন, মে‑জুনে প্রত্যেকে তিনজন, জুলাই‑আগস্টে মোট আটজন, সেপ্টেম্বর‑অক্টোবর‑নভেম্বর মাসে মোট বারোজনের মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। একই সময়ে ১৫৯ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।পুলিশের তালিকায় বর্তমানে ২২টি সন্ত্রাসী সংগঠন ও কিশোর গ্যাং রয়েছে। প্রধান গ্যাংগুলো হল ‘বি’ কোম্পানি (রনি চৌধুরী/বাবু চৌধুরী/গ্রেনেড বাবু নেতৃত্বে), আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, ডেঞ্জার বয়েজ, টেঙ্কি শাওন গ্রুপ, আরমিন গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, সেভেন স্টার, নাইন্টিন বয়েজ, ব্লাড বয়েজ, ব্ল্যাক ঈগল, ডার্ক নাইটস, সিন্ডিকেট, চিংড়ি পলাশ গ্রুপ এবং রকি গ্রুপ। এই গ্যাংগুলো মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য একে অপরকে হত্যা করে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে দমবন্ধ হয়ে পড়েছে।কেএমপি সূত্রে বর্তমানে ১৫ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত, যাদের মধ্যে কিছু কারাগার থেকে বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। ‘বি’ কোম্পানির শীর্ষ নেতা রনি চৌধুরী (বাবু চৌধুরী, গ্রেনেড বাবু) ভারতের বোম্বে বা মালয়েশিয়া থেকে নির্দেশনা পাচ্ছেন বলে দাবি করা হয়। গ্রেনেড বাবুর মাদক বিক্রির আয় দিনে অর্ধ কোটি টাকারও বেশি, যা তাকে অপরাধের শীর্ষে রাখে। কয়েক মাস আগে শামসুর রহমান রোডে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার বাবা মিন্টু চৌধুরীসহ দুই‑তিনজন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়।হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চাঁদাবাজি শহরে ছড়িয়ে রয়েছে। ‘বি’ কোম্পানি স্বনামধন্য চিকিৎসক, ক্লিনিক ও সরকারি কর্মকর্তা সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর কোটি টাকার চাঁদা দাবি করে। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি আয়ম খান কমার্স কলেজের পাশে একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা চাঁদা নেওয়া হয়, আর সাব‑রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে চাঁদা মুক্তি পেতে হয়। একই গ্যাং একটি ক্লিনিকের ওপর ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে, না দিলে ভাঙচুর করে।অ্যাক্সটর্সনও সীমাবদ্ধ নয়। ২৬ অক্টোবর পাইকগাছা উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদকে ফোনে চাঁদা ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। একদিন আগে একই উপজেলায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও হুমকি জানানো হয়।অবস্থা নিয়ে নাগরিক নেতা ও মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা নাজুক হয়ে দাঁড়িয়েছে; সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য শহরের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে আছে। মানবাধিকার সংস্থার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম উল্লেখ করেন, প্রকৃত সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত না করলে শান্তি ফিরিয়ে আনা কঠিন।পুলিশের ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, মাদককেন্দ্রিক অপরাধই মূল সমস্যা; কিশোর‑তরুণদের মাধ্যমে সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। জেলা পুলিশ সুপারভাইজর ওমর ফারুক জানান, সন্ত্রাস দমন করতে ব্লক রেইড, স্পট রেড ও তালিকা অনুসারে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হচ্ছে; মাদক স্পটগুলোতে হানা দেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় আটক ৫৯৮

গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় অভিযানে ৫৯৮ জন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে এবং ৪১টি মামলা দায়ের করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রমনা এলাকায় ৩৬ জন, লালবাগে ৪২ জন, ওয়ারীতে ৭১ জন, মতিঝিলে ৭১ জন, তেজগাঁয়ে ১০০ জন, মিরপুরে ১৭৮ জন, গুলশানে ৫৪ জন, উত্তরায় ৪৩ জন এবং গোয়েন্দা বিভাগে ৩ জন অভিযুক্ত রয়েছে।অভিযানের সময় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড গুলি, ব্যবহার করা গুলির অংশ, তিনটি চাকু, আটটি রড, ১ কেজি ৪৫০ গ্রাম গাঁজা, ২১ প্যাকেট পুরিয়া গাঁজা, ৯০৫৮টি ইয়াবা প্যাকেট, দুই গ্রাম হেরোইন, একটি প্রাইভেট কার, একটি মোটরসাইকেল, বারোটি মোবাইল ফোন, ৩২০টি ২০০ টাকার জালনোট, একটি সিপিইউ, একটি স্ক্যানার, একটি মাউস, একটি কীবোর্ড, মোট ১০,১০০ টাকা এবং একজন ভিকটিম উদ্ধার করা হয়েছে।ডিএমপি আরও জানায়, শনিবারের অভিযানেও বিভিন্ন থানা এলাকায় একই ধরণের পদক্ষেপ নিয়ে অপরাধী ধরা এবং মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলছে।

রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় আটক ৫৯৮