ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্মার্টকার্ড ও অনলাইনে জাল নথি তৈরি চক্রের চার সদস্য গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন যশোরের শার্শার মূলহোতা মো. খালিদ হাসান বিপ্লব।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে শহরের রেলবাজার এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৬ যশোর ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল। এ সময় তাদের আস্তানা থেকে বিভিন্ন দেশের নামে তৈরি নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভুয়া ভোটার আইডি কার্ড এবং অনলাইনে জাল নথি তৈরিতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক কম্পিউটারসহ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, ঝিনাইদহ সদরের বোংকিরা গ্রামের আল মুছাব্বির রিয়াদ (২৪), যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার কলাগাছি গ্রামের রাসেল হোসেন (২২), ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাথানগাছি গ্রামের ফাহিম সাদিক (২৩) এবং একই উপজেলার জলিলপুর গ্রামের সিয়াম আলী (২১)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. খালিদ হাসান বিপ্লবের মূল বাড়ি যশোরের শার্শা উপজেলার লক্ষ্মণপুর গ্রামে। ২০১৪ সালে যশোরে এসে শুরুতে শহরের কারবালা মোড়ে একটি স্টেশনারি দোকান দেন। তবে ছয় মাসের মাথায় ব্যবসা গুটিয়ে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান।
শহরের অম্বিকা বসু লেন এলাকার ‘ট্রাস্ট অটোমোবাইল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের আড়ালে তিনি এই বিশাল অনলাইন প্রতারণা ও আন্তর্জাতিক জালিয়াতির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুনরায় যশোরে ফিরে ই-কমার্স ব্যবসার আড়ালে সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। এরপরই তার ভাগ্যের চাকা অলৌকিকভাবে ঘুরে যায়। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে কারবালা সড়কে একটি বিলাসবহুল বাড়ি কেনেন এবং দামি গাড়ি হাঁকিয়ে বিলাসী জীবনযাপন শুরু করেন।
একপর্যায়ে শহরের আরএন রোড এলাকায় ‘ট্রাস্ট অটোমোবাইল’ নামের লুব্রিকেন্ট ব্যবসার একটি ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করেন। বাস্তবে পার্টস ও লুব্রিকেন্ট ব্যবসার আড়ালেই চলতো আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে তথ্য কেনাবেচা ও জাল নথি তৈরির কারবার।
অভিযানের পর এসআরবি জানায়, চক্রটির মূল লক্ষ্য ছিল প্রবাসগামী সহজ-সরল মানুষ। তারা বিভিন্ন দেশের মূল নাগরিকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পরিচয়পত্রের ডেটা হ্যাক বা অবৈধভাবে সংগ্রহ করতো। এরপর বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেসব নথিতে বাংলাদেশি প্রবাসগামীদের ছবি ও তথ্য বসিয়ে হুবহু আসল নথির মতো তৈরি করতো।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে চক্রের এক সদস্য জানান, মূলত বিদেশি সাইট থেকে অনলাইনে ভুয়া নথির অর্ডার নেওয়া হতো। পরে ফটোশপের মাধ্যমে প্রবাসগামীদের তথ্য বসিয়ে চড়া দামে বিক্রি করা হতো। অভিযানে চারজন ধরা পড়ার পর কাজ স্থগিত হলেও বর্তমানে বিপ্লব ও তার বাবা মো. জাহাঙ্গীর আলমের তত্ত্বাবধানে আবারো সিন্ডিকেটটি সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
ওই সদস্য আরও বলেন, ২৭ সেপ্টেম্বরের অভিযানের দিন বিপ্লব ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সুযোগ বুঝে কৌশলে সটকে পড়েন। পালিয়ে যাওয়ার সময় তার চারটি ডিজিটাল ব্যাংক কার্ডে প্রায় ৫৭ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭০ লাখ টাকা) গচ্ছিত ছিল।
এদিকে, চক্রের ফাঁদে পড়ে বিপাকে পড়েছেন বিপ্লবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী দীপ্ত ও তার পরিবার। শহরের বিমান অফিস মোড়ের বাসিন্দা মিরাজ হোসেন বলেন, ‘আমার ছোট ভাই দীপ্তকে অটো পার্টসের দোকানে কাজ দেওয়ার কথা বলে সাথে রেখেছিল বিপ্লব। আমরা জানতাম, সে দোকানে চাকরি করে। প্রশাসনের অভিযানের পরই তার আসল কুকর্ম জানতে পারি।’
দীপ্ত এই অপরাধে জড়িত না থাকলেও গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে দাবি তার।
অভিযানের দিন উদ্ধারকৃত কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক ও মোবাইলফোন থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড উদ্ধার করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআরবি যশোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার নাঈম উল হক জানান, পলাতক বিপ্লবসহ চক্রের অন্যান্য সহযোগীদের অবস্থান চিহ্নিত করার কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক এই ডিজিটাল অপরাধ চক্রের মূলহোতা বিপ্লবকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
মতামত