দৈনিক আদ্যোপান্ত

যশোরে স্বাধীন হত্যায় এবার পাল্টা সংবাদ সম্মেলন



যশোরে স্বাধীন হত্যায় এবার পাল্টা সংবাদ সম্মেলন

যশোর শহরের বারান্দি মোল্লাপাড়ার মালোপাড়ায় ১৬ বছরের কিশোর স্বাধীনের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। 

বিগত দিনে সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের অভিযোগ, চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার দুই দিন পর তার মৃত্যু হয়। 

অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা ও কমিউনিটি নেতাদের দাবি, গভীর রাতে একটি বাড়ির পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ছেলেটিকে তারাই উদ্ধার করেন। তাদের ধারণা, গাছ বা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে আহত হয়ে থাকতে পারে সে।

ঘটনার পর উদ্ধারকারীদের কয়েকজনকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। তাদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মামলার এক আসামি রনি ঘটনার সময় যশোরের বাইরে পিরোজপুরে ছিলেন বলে তার পরিবারের দাবি। 

ফলে স্বাধীনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বাদী, বিবাদী ও সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। পুলিশ বলছে, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন। প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৮ অক্টোবর দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমীর রাতে মালোপাড়ায় মারধরে আহত হয় স্বাধীন। সেখান থেকে বাবা টিপু তাকে উদ্ধার করে প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ২০ অক্টোবর দুপুরে ঢাকার হোম কেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

স্বাধীনের বাবা টিপু থাকেন মোল্লাপাড়া বাঁশতলা এলাকায়। মা সুমাইয়া আক্তার বর্তমানে পুলিশ লাইন টালিখোলা এলাকায় বসবাস করেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তাদের বিচ্ছেদ হয়। চার ভাইবোনের মধ্যে স্বাধীন ছিল সবার বড়। মায়ের সঙ্গে থাকা স্বাধীন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে বন্ধ করে দেয়। মাঝেমধ্যে সে দাদার বাড়িতে যেত।

গত ২৬ অক্টোবর প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে ছেলে ‘হত্যার’ বিচার ও আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান সুমাইয়া আক্তার। তার অভিযোগ, ১৮ অক্টোবর রাতে ফুফা জীবনের সঙ্গে পূজা দেখতে বের হয় স্বাধীন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে মালোপাড়া এলাকার একটি মন্দিরসংলগ্ন গলিতে তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে কয়েকজন মারধর করেন। খবর পেয়ে তার বাবা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

সুমাইয়া আক্তারের দাবি, স্বাধীনকে হাসপাতালে নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২৪ অক্টোবর যশোর কোতোয়ালি থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন তিনি। মামলায় আরও চার-পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

নাম উল্লেখ করা আসামিরা হলেন ওই এলাকার মিসেস ওলি (৪২), তার মেয়ের স্বামী রেজা (৩২), মোহাম্মদ আলী (৫৫), রনি (২৮), পার্থ (২৭) ও নারায়ণ (৪৩)। রেজার বাবার নাম ইদ্রিস আলী।

সংবাদ সম্মেলনে সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘আমি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি চাই না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে চাই।’

তিনি স্বাধীনের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের গ্রেপ্তার ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৮ অক্টোবর রাতে মালোপাড়া পূজামণ্ডপে ছিল মানুষের ভিড়। মণ্ডপের পূর্ব পাশ দিয়ে একটি গলি চলে গেছে। কিছু দূর এগিয়ে ডান দিকে আরেকটি গলি। ওই গলির শেষ বাড়িতে থাকেন মামলার আসামি মোহাম্মদ আলী। তার আগের দোতলা বাড়িটি মিসেস ওলির।

ওলির বোন শাম্মী আক্তার ও মেয়ে অন্তরা জানান, ঘটনার রাতে পরিবারের পাঁচ-ছয়জন সদস্য বাড়িতে ছিলেন। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে রান্নাঘরের পাশে ঝোপের মধ্যে শব্দ শুনতে পান তারা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে একজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। সেখান থেকে গোঙানির শব্দ আসছিল। পরে তারা পাশের বাড়ির মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে অনিকে খবর দেন।

সে সময় আশপাশের আরও কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দারা বেরিয়ে আসেন। খবর দেওয়া হয় এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কমিউনিটি পুলিশিং সদস্যদের। তাদের মধ্যে মামলার আসামি নারায়ণ ও পার্থসহ ১৫-২০ জন ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে এসে তারা ঝোপের মধ্যে একটি ছেলেকে পড়ে থাকতে দেখেন। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল।

পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ ও আনসার সদস্যরাও সেখানে যান। উপস্থিত কেউ ছেলেটিকে চিনতে পারেননি বলে তাদের দাবি।

মামলার আসামি রনির ভাই অনি, পার্থর মা অনিমা বিশ্বাস ও নারায়ণের স্ত্রী তাপতী বিশ্বাসের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন ও আনসার সদস্যরা আহত ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করেন, সে সেখানে কেন এসেছে এবং কীভাবে তার মাথায় আঘাত লেগেছে।

তাদের দাবি, স্বাধীন তখন বলেছিল, ‘ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে এসেছি।’ সেখানে ওয়াই-ফাই সংযোগ নেই জানালে সে আর কোনো উত্তর দেয়নি।

সে আরও বলেছিল, দুজন ব্যক্তি তাকে সেখানে বসিয়ে রেখে গেছে। তাদের একজনের নাম আল-আমিন বললেও অন্যজনের নাম জানাতে পারেনি।

পরে আনসার সদস্যরা তাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে বসান। সেখানে যান মিসেস ওলিও। তার পরামর্শে স্বাধীনের মাথায় হলুদ লাগিয়ে ছেঁড়া কাপড় দিয়ে বেঁধে দেন উত্তমের ছেলে উজ্জ্বল।

এরপর কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের ‘জ’ ইউনিটের সভাপতি সোহরাব হোসেন ছোটকে খবর দেওয়া হয়। তিনি অন্য নেতাদের নিয়ে সেখানে যান। তাদের দাবি, স্বাধীন নিজের বাবার মোবাইল নম্বর দিলে তারা টিপুকে ফোন করেন। টিপু তার সঙ্গী নাসিরকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যান। পরে স্বাধীনকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে হাসপাতালে যান তারা।

কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি সোহরাব হোসেন ছোট বলেন, ‘সংবাদ পেয়ে পূজামণ্ডপের সামনে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি ছেলেকে বসে থাকতে দেখি। তাকে আগে কখনো দেখিনি। সে নিজের নাম স্বাধীন এবং বাবার নাম টিপু বলে জানায়। তাকে কেউ মারধর করেছে—এমন কথা সে বলেনি। কী কারণে সেখানে গিয়েছিল, তা-ও ঠিকমতো বলতে পারেনি। আল-আমিন নামে একজনের কথা বলেছিল। তার অন্য সঙ্গীর নাম বলতে পারেনি।’

সোহরাব হোসেন ছোট আরও দাবি করেন, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনের বক্তব্য এলাকার লোকজনের মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা আছে।

স্থানীয় মৃত অর্জুন বিশ্বাসের বৃদ্ধা স্ত্রী আরতি বিশ্বাস জানান, রাতের দিকে তিনিও একটি শব্দ শুনেছিলেন। তখন তিনি টিউবওয়েলের পাশে ছিলেন। পরে প্রাচীরের সামনে গিয়ে উঁকি দিয়ে একটি ছেলেকে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর এলাকার লোকজন তাকে উদ্ধার করেন।

মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী সাহানা বেগম বলেন, ছেলেটি ঝোপের পাশে পড়ে আছে শুনে তিনিও বাইরে যান। তার ধারণা হয়েছিল, চুরি করতে গিয়ে কেউ আটক হয়েছে। কারণ এর আগে তার বাড়ি ও আশপাশের বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা ঘটেছিল।

সাহানা বেগমের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে একটি নারকেল গাছ ও পাশে তিনটি কাঁচা নারকেল পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। লোকজন ছেলেটিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলেন, সেও নানা ধরনের উত্তর দিচ্ছিল। পরে আনসার ও পুলিশ সদস্যরা তাকে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, ‘দুই দিন পর শুনেছি ছেলেটি মারা গেছে। এরপর মামলা হয়েছে। যারা তাকে উদ্ধার করেছে, তারাই আসামি।’

মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী সাহানা বেগমের অভিযোগ, তার ছেলে রনিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। তার দাবি, রনি গত ১ অক্টোবর থেকে চাকরির প্রয়োজনে পিরোজপুরে ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না।

সাহানা বেগম বলেন, ‘অভিযোগ দিলো আর পুলিশ মামলা নিয়ে নিলো। পুলিশ তদন্ত না করে মামলা নিয়েছে। আমার ছেলে রনি ঘটনার দিন বাড়িতে ছিল না। অথচ তাকে আসামি করা হলো।’

বাদী কীভাবে আসামিদের নাম পেয়েছেন—সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এদিকে, স্থানীয় কয়েকজনের ধারণা, ঘটনার রাতে স্বাধীন তার সঙ্গীদের নিয়ে মিসেস ওলির বাড়ির পেছনে গিয়েছিল। ওই বাড়ির ছাদে শতাধিক কবুতর রয়েছে। ভবনের পাশে একটি নারকেল গাছও আছে। তাদের ধারণা, নারকেল গাছ বেয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে স্বাধীন নিচে পড়ে যেতে পারে। ভবনের পাশে নিচু প্রাচীর থাকায় পড়ে যাওয়ার সময় সেখানে মাথায় আঘাত লেগে থাকতে পারে। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়ে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

তবে এটি স্থানীয়দের ধারণা মাত্র। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

স্বাধীনের মা সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে সাক্ষাৎ করতে চাইলে তিনি পরে দেখা করবেন বলে জানান। ফোনে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের কেউ আটক হয়নি। আমি নিরাপত্তাহীনতায় 

বিষয় : যশোর পত্রিকা অনলাইন সংবাদ খবর দৈনিক আদ্যোপান্ত jessore jashore news media khobor dainik adyopanto song সাংবাদিক

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

দৈনিক আদ্যোপান্ত

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬


যশোরে স্বাধীন হত্যায় এবার পাল্টা সংবাদ সম্মেলন

প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

যশোর শহরের বারান্দি মোল্লাপাড়ার মালোপাড়ায় ১৬ বছরের কিশোর স্বাধীনের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। 

বিগত দিনে সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের অভিযোগ, চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার দুই দিন পর তার মৃত্যু হয়। 

অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা ও কমিউনিটি নেতাদের দাবি, গভীর রাতে একটি বাড়ির পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ছেলেটিকে তারাই উদ্ধার করেন। তাদের ধারণা, গাছ বা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে আহত হয়ে থাকতে পারে সে।

ঘটনার পর উদ্ধারকারীদের কয়েকজনকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। তাদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মামলার এক আসামি রনি ঘটনার সময় যশোরের বাইরে পিরোজপুরে ছিলেন বলে তার পরিবারের দাবি। 

ফলে স্বাধীনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বাদী, বিবাদী ও সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। পুলিশ বলছে, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন। প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।


স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৮ অক্টোবর দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমীর রাতে মালোপাড়ায় মারধরে আহত হয় স্বাধীন। সেখান থেকে বাবা টিপু তাকে উদ্ধার করে প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ২০ অক্টোবর দুপুরে ঢাকার হোম কেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

স্বাধীনের বাবা টিপু থাকেন মোল্লাপাড়া বাঁশতলা এলাকায়। মা সুমাইয়া আক্তার বর্তমানে পুলিশ লাইন টালিখোলা এলাকায় বসবাস করেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তাদের বিচ্ছেদ হয়। চার ভাইবোনের মধ্যে স্বাধীন ছিল সবার বড়। মায়ের সঙ্গে থাকা স্বাধীন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে বন্ধ করে দেয়। মাঝেমধ্যে সে দাদার বাড়িতে যেত।

গত ২৬ অক্টোবর প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে ছেলে ‘হত্যার’ বিচার ও আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান সুমাইয়া আক্তার। তার অভিযোগ, ১৮ অক্টোবর রাতে ফুফা জীবনের সঙ্গে পূজা দেখতে বের হয় স্বাধীন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে মালোপাড়া এলাকার একটি মন্দিরসংলগ্ন গলিতে তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে কয়েকজন মারধর করেন। খবর পেয়ে তার বাবা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

সুমাইয়া আক্তারের দাবি, স্বাধীনকে হাসপাতালে নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২৪ অক্টোবর যশোর কোতোয়ালি থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন তিনি। মামলায় আরও চার-পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

নাম উল্লেখ করা আসামিরা হলেন ওই এলাকার মিসেস ওলি (৪২), তার মেয়ের স্বামী রেজা (৩২), মোহাম্মদ আলী (৫৫), রনি (২৮), পার্থ (২৭) ও নারায়ণ (৪৩)। রেজার বাবার নাম ইদ্রিস আলী।

সংবাদ সম্মেলনে সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘আমি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি চাই না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে চাই।’

তিনি স্বাধীনের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের গ্রেপ্তার ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।



স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৮ অক্টোবর রাতে মালোপাড়া পূজামণ্ডপে ছিল মানুষের ভিড়। মণ্ডপের পূর্ব পাশ দিয়ে একটি গলি চলে গেছে। কিছু দূর এগিয়ে ডান দিকে আরেকটি গলি। ওই গলির শেষ বাড়িতে থাকেন মামলার আসামি মোহাম্মদ আলী। তার আগের দোতলা বাড়িটি মিসেস ওলির।

ওলির বোন শাম্মী আক্তার ও মেয়ে অন্তরা জানান, ঘটনার রাতে পরিবারের পাঁচ-ছয়জন সদস্য বাড়িতে ছিলেন। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে রান্নাঘরের পাশে ঝোপের মধ্যে শব্দ শুনতে পান তারা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে একজনকে পড়ে থাকতে দেখেন। সেখান থেকে গোঙানির শব্দ আসছিল। পরে তারা পাশের বাড়ির মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে অনিকে খবর দেন।

সে সময় আশপাশের আরও কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দারা বেরিয়ে আসেন। খবর দেওয়া হয় এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কমিউনিটি পুলিশিং সদস্যদের। তাদের মধ্যে মামলার আসামি নারায়ণ ও পার্থসহ ১৫-২০ জন ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে এসে তারা ঝোপের মধ্যে একটি ছেলেকে পড়ে থাকতে দেখেন। তার মাথা থেকে রক্ত ঝরছিল।

পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ ও আনসার সদস্যরাও সেখানে যান। উপস্থিত কেউ ছেলেটিকে চিনতে পারেননি বলে তাদের দাবি।


মামলার আসামি রনির ভাই অনি, পার্থর মা অনিমা বিশ্বাস ও নারায়ণের স্ত্রী তাপতী বিশ্বাসের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন ও আনসার সদস্যরা আহত ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করেন, সে সেখানে কেন এসেছে এবং কীভাবে তার মাথায় আঘাত লেগেছে।

তাদের দাবি, স্বাধীন তখন বলেছিল, ‘ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে এসেছি।’ সেখানে ওয়াই-ফাই সংযোগ নেই জানালে সে আর কোনো উত্তর দেয়নি।

সে আরও বলেছিল, দুজন ব্যক্তি তাকে সেখানে বসিয়ে রেখে গেছে। তাদের একজনের নাম আল-আমিন বললেও অন্যজনের নাম জানাতে পারেনি।

পরে আনসার সদস্যরা তাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে বসান। সেখানে যান মিসেস ওলিও। তার পরামর্শে স্বাধীনের মাথায় হলুদ লাগিয়ে ছেঁড়া কাপড় দিয়ে বেঁধে দেন উত্তমের ছেলে উজ্জ্বল।

এরপর কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের ‘জ’ ইউনিটের সভাপতি সোহরাব হোসেন ছোটকে খবর দেওয়া হয়। তিনি অন্য নেতাদের নিয়ে সেখানে যান। তাদের দাবি, স্বাধীন নিজের বাবার মোবাইল নম্বর দিলে তারা টিপুকে ফোন করেন। টিপু তার সঙ্গী নাসিরকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যান। পরে স্বাধীনকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে হাসপাতালে যান তারা।

কমিউনিটি পুলিশিং ফোরামের সভাপতি সোহরাব হোসেন ছোট বলেন, ‘সংবাদ পেয়ে পূজামণ্ডপের সামনে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি ছেলেকে বসে থাকতে দেখি। তাকে আগে কখনো দেখিনি। সে নিজের নাম স্বাধীন এবং বাবার নাম টিপু বলে জানায়। তাকে কেউ মারধর করেছে—এমন কথা সে বলেনি। কী কারণে সেখানে গিয়েছিল, তা-ও ঠিকমতো বলতে পারেনি। আল-আমিন নামে একজনের কথা বলেছিল। তার অন্য সঙ্গীর নাম বলতে পারেনি।’

সোহরাব হোসেন ছোট আরও দাবি করেন, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনের বক্তব্য এলাকার লোকজনের মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা আছে।


স্থানীয় মৃত অর্জুন বিশ্বাসের বৃদ্ধা স্ত্রী আরতি বিশ্বাস জানান, রাতের দিকে তিনিও একটি শব্দ শুনেছিলেন। তখন তিনি টিউবওয়েলের পাশে ছিলেন। পরে প্রাচীরের সামনে গিয়ে উঁকি দিয়ে একটি ছেলেকে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর এলাকার লোকজন তাকে উদ্ধার করেন।

মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী সাহানা বেগম বলেন, ছেলেটি ঝোপের পাশে পড়ে আছে শুনে তিনিও বাইরে যান। তার ধারণা হয়েছিল, চুরি করতে গিয়ে কেউ আটক হয়েছে। কারণ এর আগে তার বাড়ি ও আশপাশের বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা ঘটেছিল।

সাহানা বেগমের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে একটি নারকেল গাছ ও পাশে তিনটি কাঁচা নারকেল পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। লোকজন ছেলেটিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলেন, সেও নানা ধরনের উত্তর দিচ্ছিল। পরে আনসার ও পুলিশ সদস্যরা তাকে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, ‘দুই দিন পর শুনেছি ছেলেটি মারা গেছে। এরপর মামলা হয়েছে। যারা তাকে উদ্ধার করেছে, তারাই আসামি।’


মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী সাহানা বেগমের অভিযোগ, তার ছেলে রনিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও মামলায় আসামি করা হয়েছে। তার দাবি, রনি গত ১ অক্টোবর থেকে চাকরির প্রয়োজনে পিরোজপুরে ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না।

সাহানা বেগম বলেন, ‘অভিযোগ দিলো আর পুলিশ মামলা নিয়ে নিলো। পুলিশ তদন্ত না করে মামলা নিয়েছে। আমার ছেলে রনি ঘটনার দিন বাড়িতে ছিল না। অথচ তাকে আসামি করা হলো।’

বাদী কীভাবে আসামিদের নাম পেয়েছেন—সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

এদিকে, স্থানীয় কয়েকজনের ধারণা, ঘটনার রাতে স্বাধীন তার সঙ্গীদের নিয়ে মিসেস ওলির বাড়ির পেছনে গিয়েছিল। ওই বাড়ির ছাদে শতাধিক কবুতর রয়েছে। ভবনের পাশে একটি নারকেল গাছও আছে। তাদের ধারণা, নারকেল গাছ বেয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে স্বাধীন নিচে পড়ে যেতে পারে। ভবনের পাশে নিচু প্রাচীর থাকায় পড়ে যাওয়ার সময় সেখানে মাথায় আঘাত লেগে থাকতে পারে। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়ে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

তবে এটি স্থানীয়দের ধারণা মাত্র। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।


স্বাধীনের মা সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে সাক্ষাৎ করতে চাইলে তিনি পরে দেখা করবেন বলে জানান। ফোনে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের কেউ আটক হয়নি। আমি নিরাপত্তাহীনতায় 


দৈনিক আদ্যোপান্ত



কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত
যশোরে স্বাধীন হত্যায় এবার পাল্টা সংবাদ সম্মেলন
0:00 0:00
1.0x